Saturday, 31 October 2020

একটি ভ্রমণের অভিজ্ঞতার গল্প

 

সাহেদ আমার ছােটবেলার বন্ধু। কিছুটা বাউন্ডেলে স্বভাবের হলেও খুব মেধাবী ছাত্র। ছুটির দিন পেলেই হলাে, কোথাও না কোথাও ঘুরতে বেরুবেই এবং সঙ্গী হিসেবে আমাকে তার সঙ্গে রাখা চাই। বিষয় তেমন কিছু না। আমি একজন ভালাে শ্রোতা। সে গল্প করে আর আমি মনােযােগ দিয়ে তার সব কথায় সায় দিই এবং শুনি। আমার নিজের যে ভালাে লাগে না, তা কিন্তু নয়। লেখাপড়া বাদেও অনেক বিষয়ে তার কাছ থেকে আমি জানতে পারি। ঘুরতে ঘুরতে এমন অবস্থা হয়েছে যে কাছাকাছি এমন কোনাে জায়গা নেই যেখানে সাহেদ আর আমি যাই নি। গেল দু মাস ধরে আমাদের কোথাও আর ঘােরা হয় না। হঠাৎ সেদিন সাহেদ এসে বলল, চল, আজ ময়নামতির প্রাসাদ দেখতে যাব। মনে বিয়ের অবধি নেই। মনে অবিশ্বাস আর সংশয়ের ছায়া দুলছে। বললাম, ইতিহাসে তাে এমন কোনাে রাজা আর তার প্রাসাদের কথা শুনি নি। এ কি জনশ্রুতি না কিংবদন্তি? সাহেদ বলল, চল আমার সঙ্গে। গেলেই তাে সব দেখতে পাবি। যথারীতি কিছু খাবার নিয়ে রওয়ানা হলাম সাইকেলে করে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এসে পৌছলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের ঠিক পূর্বে ময়নামতি গ্রামের নিকটবর্তী শৈলশির উত্তরপ্রান্তের এক সর্ববৃহৎ টিলার নিচে দাঁড়িয়ে আছি আমরা দুজন। সাহেদ আঙুল উঁচিয়ে আমাকে দেখলে, চল, ওই টিলার উপরেই ময়নামতির প্রাসাদ। তার কথায় আমি না হেসে পারলাম না। সাহেদ বলল, আরে বেক এই টিলাটির নামই ময়নামতি প্রাসাদ টিলা। যাক, দুজনে এবার টিলায় উঠতে শুরু করলাম। লাল মাটির ভাঙা ভাঙা রাতা। প্রখর রােদের তাপ। মাঝে মাঝে গাছের ছায়ায় একটু বসে হাওয়া খেয়ে নিচ্ছি। সাইকেল নিয়ে উঠতে গিয়ে দুজনেই হাঁপিয়ে গেছি। সিদ্ধান্ত নিলাম সাইকেল দুটি এখানে তালা বন্ধ করে রেখে যাই। কিন্তু আমার সইকেলে তালা নেই। কী বিপদ। সাইকেল নিয়ে টিলার উপরে ওঠা অসম্ভব। অগত্যা রেখেই রওয়ানা হলাম। ভা-চেরা বই পথে আমরা উপরে উঠছি। কয়েক মিনিট হাঁটতেই আমরা এক টিলার উপরে এসে হাজির হলাম। কী চমংকর শ্য, অদুরেই ক্ষীণকায় গােমতী নদী বয়ে যাচ্ছে। অথচ বর্ষায় তার কী ভয়াল রূপ। সাহেদ আমাকে বলল, জনি গােমতীর আদি নাম কী ছিল? সাহেদের গল্প শুরু হলে আর থামে না। সব তথ্যসূত্র নিয়েই ও ঘুরতে আসে। রূপন্থর গল্পের মতাে বলতে শুরু করলাে সাহেদ গােমতী নদীর প্রাচীন নাম ছিল ক্ষীরােদা নদী। এই টিলা ঘেঁষেই একসময় নদীটি প্রবাহিত হতাে। এ স্থানেই চন্দ্রবংশের কিংবদন্তির রানি ময়নামতির নিবাস ছিল। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ইট- পাথর ছড়ানাে বিশাল প্রাসাদটির মুখােমুখি এসে দাঁড়ালাম। সাহেদ আমাকে কাছে টেনে এনে তার পাশে দাড় করিয়ে বলল– ময়নামতি ছিলেন চন্দ্রবংশের শেষ রাজা গােবিন্দচন্দ্রের মা। এই স্থানই চন্দ্রংশের শেষ রাজধানী ছিল।। একটা গাছের তলায় বসে পড়লাম দুজনে। খাবারের টিফিন কেরিয়ারটি খুলে খেতে খেতে সাহেদের মুখে ময়নামতির গল্প আর নানা জনশুতি শুনতে শুনতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে আমি যেন ময়নামতির রাজপ্রাসাদের দেউড়ি পার হয়ে জলসা ঘরের উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছি। ভেতরে বাজছে নৃত্যরতা বাইজির প্র, রাজা নজরানা ছুঁড়ে দিচ্ছেন মুঠো মুঠো করে। জানি না এ সবের বাস্তব অতিত্ব ছিল কতটুকু। তবে আমার স্মৃতিতে মধুর স্বপ্ন হয়ে যা বেঁচে রইলাে তার মূল্য তাে সােনা-দানা টাকা-কড়িতে মাপা যাবে না। —মিঠু বিশ্বাস।

No comments:

Post a Comment

ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

  শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর মেয়াদি কোর্সে পড়ার সময় মার্ক ট্যুর এর একটা সুযােগ পাওয়া গেল। এটা। হমদের জন্য মহা আনন্দের বিষয...